জাঁস্কারের বন্দীদশা

জাঁস্কারের বন্দীদশা

জাঁস্কার হল লাদাখের প্রাচীনতম অঞ্চল, দুর্গমও বটে। তাই লাদাখের অন্যান্য জায়গার থেকে জাঁস্কার কিছুটা বিচ্ছিন্ন। যেখান দিয়েই যাওয়া হোক না কেন, এখানে যেতে গেলে কোনো না কোনো গিরিপথ (Pass) অতিক্রম করতেই হবে। লাদাখি ভাষায় গিরিপথকে বলা হয় ‘লা’ (La)। যদি কার্গিল থেকে জাঁস্কার যেতে হয় তবে পেরোতে হবে ‘পেনজি লা’ (Penzi La)। যদি মানালি থেকে সরাসরি জাঁস্কার যেতে হয় তবে পেরোতে হবে ‘সিঙ্কু লা’ (Singku La)। আর যদি লামায়ুরু থেকে জাঁস্কার যেতে হয় তবে পেরোতে হবে তিনটি লা যথা ‘সিরসির লা’ (SirSir La), ‘সিঙ্গে লা’ (Singe La) এবং ‘মুরগুম লা’ (Murgum La)। লেহ্‌ (নিমু) থেকে সরাসরি জাঁস্কার যাবার রাস্তা তৈরির চেষ্টা চলছে গত তিন বছর যাবৎ। এ রাস্তা তৈরি চলছে জাঁস্কার নদী বরাবর পাহাড় কেটে। সে গল্প অন্যত্র করা যাবে। তবে এখনও তা সম্পূর্ণ হতে বছর খানেক লাগবে। কোনরকমে ছোটো গাড়ি যাবার জন্য সপ্তাহে একদিন রাস্তা খোলা হয়। বাকি দিন রাস্তা তৈরির কাজ চলে।

পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি চলছে

২৫’সালে আমার সাইকেল যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল লামায়ুরু থেকে তিনটি গিরিপথ যথা ‘SirSir La’, ‘Singe La’ এবং ‘Murgum La’ পেরিয়ে জাঁস্কার যাওয়া (যার মধ্যে ‘Singe La’ সবচেয়ে বিপদসংকুল) এবং জাঁস্কার থেকে সরাসরি ‘Singku La’ টপকে মানালিতে ফিরে আসা। ‘Murgum La’ টপকে ‘লিংশেড গোম্ফা’তে একটা গোটা দিন ছিলাম। পরদিন নীল আকাশকে সঙ্গী করে আমার অবতরণ শুরু। সে রাস্তা কাঁচা ও বড় কঠিন উৎরাই। সাইকেল চালিয়ে নামা তো দূর অস্ত, হেঁটে নামতেও হাত ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তা একটা সময় জাঁস্কার নদীর ধারে এসে মিলেছে। তারপর নদীর ধার বরাবর উজানের দিকে এগিয়ে চলা। এখানে আবার পাথর ফেলে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ফলা বের করা স্ফটিকাকৃতি সে পাথরের ওপর দিয়ে সাইকেলের চাকা যতই গড়াচ্ছে, কেবলই মনে হচ্ছে এই বুঝি চাকা লিক্‌ হল বলে। যত এগোচ্ছি নিজেকে বোঝাচ্ছি, এখনও লিক্‌ হয়নি কেন সেটাই আশ্চর্যের। অতএব মন প্রস্তুত রাখো, যেকোনো সময় হাতে যন্ত্রপাতি নিয়ে রাস্তার ধারে বসতে হতে পারে।

লিংশেড গোম্ফা থেকে শুধু নামতেই লেগে গেল চার ঘণ্টার ওপর। তারপর নদী ধরে একটু একটু করে ওপরে ওঠা। যখন ‘জাংলা’ পৌছলাম ঘড়িতে সময় সন্ধ্যে সাতটা। প্রথমেই যে বিপত্তিটা হল, হাওয়ায় পড়ে গিয়ে সাইকেলের ব্রেকটা গেল ভেঙ্গে। একটা অশনিসংকেত মনের মধ্যে দানা বাঁধল। আকাশে বিকেল থেকেই মেঘ জমেছে। হাওয়ার গতিবেগটা যেন বাড়তে লাগলো। জাংলা গ্রামটা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু সেখানে পৌঁছতে গেলে বেশ কয়েক কিমি পাহাড়ের কোলে উঠতে হবে। সে সময় নেই, অন্ধকার 

হয়ে আসছে। রাস্তার ধারে একটিই দোকান আছে। দোকান না বলে গুম্‌টি বলাই ভাল। তবে তার পাশে একটা টেবিল ও চারটে চেয়ার পাতা, আড্ডা মারার মতো কিছুটা পরিসর আছে। মাথাটা টেন্টের কাপড়ে আচ্ছাদিত। আমার টেন্ট আছে শুনে দোকানদার বলছিলেন রাস্তার ধারে যেখানে খুশি টেন্ট খাটাতে। কিন্তু লাদাখের প্রচণ্ড হাওয়ার 

অভিজ্ঞতা আমার আছে। তাই চাইছিলাম আচ্ছাদিত স্থানে টেন্ট খাটাতে, আমার সুবিধে হবে। রাতে তাঁর কাছে খাবো এই ভেবে তিনি টেন্ট খাটাতে দিতে রাজি হলেন।

মালিক মানুষটা কিন্তু ভাল। আগে থেকেই বলে দিলেন, রাতে উনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাবেন। এখানে বাইরে আমাকে অন্ধকারে একা থাকতে হবে। আমি বললাম কুচ পরোয়া নেহি। আমার কাছে আলো আছে। শুধু বললাম যাবার আগে একটু জল রেখে যাবেন। ওখানে একটা সুবিধে হল রাত আটটা অবধি আকাশে আলো থাকে। তার মধ্যে টেন্টটা খাটিয়ে ফেলেছি। তাঁর দোকানে খেয়ে নিলাম। এরপর

তিনি চলে গেলেন। অন্ধকার ধু-ধু চারিদিক, একা আমি রাস্তার ধারে টেন্টে শুয়ে আছি। চারিধারে শন্‌-শন্‌ হাওয়া বইছে। সে হাওয়ায় দোকান পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার চারিদিক ও মাথাটা মোটা কাপড় দিয়ে ঘেরা বলে আমার নিজের টেন্টে ঝড়ের প্রভাবটা সরাসরি পড়ছে না। ভাবছি এই আচ্ছাদিত জায়গায় না থাকলে আমার আজ কি দশা হতো। মাঝরাতে টিপটিপ আওয়াজ শুনেই বুঝেছি বৃষ্টি নেমেছে। একে ঠাণ্ডা, তার ওপর হাওয়া, তার ওপর বৃষ্টি, পরিবেশটা নিমেষে হাতের বাইরে চলে গেল। গুঁড়িসুড়ি মেরে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে শুয়ে রইলাম। আলো ফুটতে টেন্টের চেন খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখি দোকানের কাপড়ের আচ্ছাদনের ছাদে বড়সড় ফুটো, তাও আবার আমার টেন্টের চেনের ওপরে। ফলে আমার টেন্ট ভিজে একাকার। তবে ভেতরে জল ঢোকেনি। এ অবস্থায় দোকানের পাশে ঘুরপাক খেতে লাগলাম। কাল মালিক বলেছিলেন আজ না-ও আসতে পারেন। অতএব এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে গেলে কিছু একটা করতে হবে।

সকাল সাতটায় মালিক হন্তদন্ত হয়ে হাজির। আমি ঠিক আছি কিনা দেখতে চলে এসেছেন। তাঁর মনে হয়েছে আমি খুব অসুবিধায় পড়েছি। তাঁর সহৃদয়তা আমার মনে বেশ প্রভাব ফেলল। দোকানে ঢুকে বললাম কিছু খাবার করুন। সেখানেই বসে রইলাম। চা ও গরম গরম রুটি অমলেট খেলাম। তারপর বললেন তাঁকে দোকান

করে বাড়ি চলে যেতে হবে, এখানে আজ কোনো খদ্দের আসবে না। অর্থাৎ আমাকে সেই বাইরে আচ্ছাদনের তলায় বসে থাকতে হবে। তিনি কিন্তু কিন্তু গলায় বলছেন বটে তবে না পারছেন আমাকে ঠেলতে, না পারছেন গিলতে। সময়ের সাথে সাথে বৃষ্টি বাড়তে লাগলো।

টি.সি.পি. - জাংলা

তিনি চলে গেলে কী করণীয় আমি ভাবতে লাগলাম। না পারছি টেন্টে ঢুকতে, না পারছি ঠাণ্ডায় বসে থাকতে। কাছেই টি.সি.পি. (Traffic Checking Police)’এর অফিস। এই রাস্তা দিয়ে যত গাড়ি ‘পাদুম’ (জাঁস্কারের প্রশাসনিক সদর দপ্তর) থেকে লেহ্‌ যায় অথবা লেহ্‌ থেকে পাদুম আসে, সবাইকে এখানে গাড়ির নম্বর ও পরিচয় লেখাতে হয়। ফলে সবাই এখানে দাঁড়ায়। ঠিক করলাম 

গাড়িতে করে পাদুম যেতে হবে, এখান থেকে প্রায় ৩০ কিমি। বৃষ্টিতে সাইকেল চালানো যাবে না। গুটিগুটি পায়ে টি.সি.পি.’র অফিসে গেলাম। দুই মহিলা দোতলায় খাতা নিয়ে বসে আছে। রাস্তা থেকে ড্রাইভারদের চিৎকার করে নাম, ধাম, নম্বর বলতে হচ্ছে। তাঁরা দড়ি আলগা করলে তবে গাড়ি যেতে পারছে। চাকরিটা মন্দ নয়। তেমন কোনো ঝামেলা নেই। দড়ি টানা আর ছাড়া, আর নাম লেখা। সকালের দিকেই একটু গাড়ি যায়। তারপর সারাদিন লেপ মুড়ি দিয়ে তাঁরা শুয়ে থাকেন।

আমি সোজা দোতলায় গিয়ে তাঁদেরকে আমার অসহায়তার কথা বললাম। দোকানে থাকলে আমার মালপত্তর সব ভিজে যাচ্ছে। আমি ঠাণ্ডায় কাঁপছি। আমাকে একটু সেখানে থাকতে দেওয়া হোক। তাঁরা বুঝলেন ও রাজি হলেন। দৌড়ে গিয়ে টেন্টটা গুটিয়ে মালপত্তর সমেত এখানে চলে এলাম। একটু স্বস্তি পেলাম। এখানটা বেশ গরম। শুকনো মেঝেতে ভিজে যাওয়া জিনিসগুলো শুকোতে দিলাম। জানলার কাছে গিয়ে দুজনের কাজ দেখতে লাগলাম। ড্রাইভারগুলো আমাকেও টি.সি.পি.’র কর্মী ভাবতে লাগলো। আমাকেই তারা নম্বর বলছে। বেশ রগড় লাগছিল। অবশ্য সে সুখ বেশিক্ষণ সইল না। একটাও গাড়ি পাচ্ছিনা আমাকে নেবার মতো। সবই যাত্রী ভর্তি। তাঁরা বললেন, “এভাবে কতক্ষণ আপনি অপেক্ষা করবেন? রাতে এখানে থাকা যাবে না। আমরা মহিলারা থাকি”। আমার ধান্দা ছিল গাড়ি না পেলে এখানেই থেকে যাবো। বিপদ বুঝে দৌড়লাম আবার সেই দোকানে। ততক্ষণে মালিক আবার এসেছেন। গিয়ে বললাম আমাকে আবার এখানে বিকেলে টেন্ট নিয়ে আসতে হবে। ওখানে মহিলারা থাকতে দেবেন না। তিনি বললেন এখানে থাকলেও বৃষ্টিতে আমি বিপদে পড়ব। তাহলে উপায়? তাঁর বাড়িতে ‘হোম-স্টে’ আছে, সেখানে চলে যেতে বললেন। আমি বললাম সে-তো অনেক খরচ। বললেন, “সে-তো বটেই। দেড় হাজার টাকা প্রতিদিন। আপনি কত দিতে পারবেন”? আমি বললাম যা অবস্থা, কতদিন থাকতে হবে জানিনা। এখানেই আমার সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। “আচ্ছা আপনি পাঁচশ টাকা দেবেন। কিন্তু বৌ’কে বলবেন হাজার টাকা”। আমি বললাম ‘হোম-স্টে’টা আপনারই তো? উনি বললেন, “হ্যাঁ রে বাবা। কিন্তু যদি শোনে যে কম টাকায় দিয়েছি, ঝামেলা করবে”। বুঝলাম সারা পৃথিবীতেই বৌ’এর ভীতি একটা কমন টপিক।

জাংলা হোম-স্টে

বাড়িতে গিয়ে মনটা খুশি হয়ে গেল। প্রায় তিন কিমি রাস্তা, ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের কোলে উঠেছে। আর একটু গেলেই জাংলা নানারি (মহিলা লামাদের মঠ)। কালকের ওই জঘন্য রাতের পর আজ যেন স্বর্গ পেলাম। বিরাট বড় ঘরে চারজনের থাকার বিছানা, খাবার টেবিল ও বিদ্যুতের আলো। মোবাইল চার্জ দিতে পারব। রাতে খুব যত্ন করে খাবার দিলেন। তাঁর স্ত্রী-ও খুব ভাল ব্যবহার করলেন। কিন্তু সারাদিন বন্দী হয়ে থাকতে হল

বৃষ্টির জন্য। মালিককে বললাম পরদিন যদি ওনার গাড়ি করে আমাকে পাদুম পৌঁছে দিয়ে আসেন। এখানে তো আর দিনের পর দিন থাকা সম্ভব নয়। উনিও বুঝলেন যে আমি চলে গেলেই মঙ্গল।

পরদিন সকাল ৬.৩০’এ গাড়ি চলতে শুরু করল পাদুমের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে সকালে গাড়ি ছাড়ে মানালি যাওয়ার জন্য। মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি গাড়ি করে মানালি ফিরে যাবো। সাইকেল আর চালানো সম্ভব নয় কারণ হাতে আর সময় নেই। চণ্ডীগড় থেকে ট্রেন ধরতে হবে পাঁচদিন পর। এদিকে জাংলাতে হাওয়ার চোটে সাইকেল উল্টে একটা ব্রেক গেছে ভেঙ্গে। বাকি একটা ব্রেকে Singku La পাস থেকে নামা সম্ভব নয়।

পাদুম গিয়ে শুনি আজ কোনো গাড়ি ছাড়বে না। বেশ কয়েক জায়গায় পাথর পড়ছে, রাস্তা ভেঙ্গে আছে। তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম যদি পূর্ণে নামক গ্রামটা অবধি কিছুটা অন্তত এগিয়ে যাওয়া যায়। বিকেল তিনটে অবধি এ-পাশ ও-পাশ করতে লাগলাম আর জায়গা খুঁজতে লাগলাম, গাড়ি না পেলে কোথায় টেন্ট খাটানো যায়। পাদুমের মোড়ে আমাকে সবাই সাইকেলওয়ালা বলে চিনেই গেল।

একটা সরকারী বড় বাড়ি তৈরি হচ্ছে, তার একতলাটা বেশ মনের মতো লাগলো। কিন্তু বাড়িটা পুরো খালি। কোনো শ্রমিককেও দেখতে পাচ্ছিনা। কাউকে জিজ্ঞাসা না করে থাকা উচিত নয়। অবশেষে এক ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম ফোন হাতে। জিজ্ঞাসা করতে বললেন উনি এখানের কেউ নন। আড্ডা মারতে এসেছেন। তারপর ফোনে কারো সাথে কথা বলে বললেন এখানে থাকা যেতে পারে। উনি এখানের সুপারভাইসারের সাথে কথা বলে অনুমতি নিলেন। আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা ভাল জায়গা দেখিয়ে বললেন এটা বেশ নিরিবিলি। আমি যত গ্রাউন্ড ফ্লোরে রাস্তার ধারে থাকতে চাইছি, রাস্তার লোকজন দেখতে পাবো, উনি ততই আমাকে নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বলছেন। শেষে বুঝিয়ে বললেন, আমার ভালোর জন্যই নাকি নিচে থাকা ভাল। এখানে রাতে অনেক লেবাররা মদ খেয়ে এসে আড্ডা মারে। কেউ বিরক্ত করতে পারে। আমি কলকাতার লোক শুনে তাঁর মনে একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। তিনি বিহারের মাতিয়ারা জেলার বাসিন্দা, নাম – ‘কিশোর’। ফলে একটা প্রতিবেশীসুলভ অনুভূতি তাঁর মনে জেগেছে। দু একবার বললেনও, তাঁর সাথে তাঁর ঘরে থেকে যেতে। ভদ্রতা করে কথার কথা বলেছেন, আমি উত্তর করিনি। পরে ভেবে দেখলাম, এতবার বলছে নিচে শুতে, কিছু সমস্যা নিশ্চয়ই আছে। মুখ ফুটে বলেই ফেললাম, তাহলে আপনার কাছেই থেকে যাবো? উত্তর শুনে মানুষের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বোঝা যায়। খুব সহৃদয়তার সাথেই তিনি বললে, “আরেবাবা, সে কথাই তো বলছি। অত ভাবছেন কেন!”

আমি আর দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ নিইনি। বললাম চলুন। তিনি আরও দুজনকে ডাকলেন। পরিচয় করালেন, একজন দাদা – লালু, একজন তাঁর শালা। যা বুঝলাম, আমার কথা ফোনে আগেই তাদের বলেছেন। কিশোর বললেন আমাকে জিনিস বহন করতে হবে না। সব ওরাই করবে। বড় রাস্তা দিয়ে আমার সব মালপত্তর ও সাইকেল নিয়ে তারা চলল। আমরা চললাম সোজা রাস্তায়। গিয়ে দেখি

কিশোরদের ভাড়া বাড়ি

আমাদের আগেই সাইকেল নিয়ে তারা পৌঁছে গেছে। পাঁচিল ঘেরা বাড়ির এলাকাটা বেশ বড়। জমির এক কোনে একটি দুই ঘর বিশিষ্ট দ্বিতল বাড়িতে কিশোররা ভাড়া থাকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথম ঘরটি শৌচালয়। দ্বিতীয় ঘরটিতে তারা তিনজন থাকে, সেখানেই রান্না করে খায়। মাটির দেওয়াল, মাটির মেঝে ও মাটির ছাদ। এটাই লাদাখের বিশিষ্ট। মালপত্তর জায়গা মতো রেখে 

আমি দেওয়ালের দিকে বসলাম। বললাম এক কাপ চা হলে ভাল হয়। কিন্তু তারা দুঃখের সঙ্গে জানাল চায়ের ব্যবস্থা তারা রাখেনি। সকাল হলেই কাজে চলে যায়, সন্ধ্যের পরে ফেরে। চা আর খাবে কখন।

সারাদিন বৃষ্টি পড়ে চলেছে। সন্ধ্যেবেলা বিদ্যুৎ চলে গেল। অন্ধকারে বাড়িওয়ালীর বোন (মাসি) এসে ঢুকলেন, সঙ্গে বাড়িওয়ালীর ছেলে। জিজ্ঞাসা করলেন আমি কে। কিশোর আমার পরিচয় দিয়ে বলল আমি একজন ট্যুরিস্ট। বৃষ্টিতে আটকে গেছি, কাল চলে যাবো। ভদ্রমহিলার কথাবার্তা রসকষহীন, অবজ্ঞার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। মনে মনে ভাবছি এই রে! ওদের না আবার বলে বসে বাইরের লোক ঢুকিয়েছ কেন। আমার জন্যে ওরা বিপদে পড়বে। তবে তারা অন্য আলোচনায় ব্যস্ত। বৃষ্টিতে নাকি ছাদে প্রচুর জল জমে গেছে, মাসি দেখতে পেয়েছেন। বললেন এখুনি ছাদের জল ফেলেতে হবে। নাহলে ছাদ ভেঙ্গে পড়বে। নতুবা জল গড়িয়ে দেওয়ালের মাটি গলিয়ে দেবে। তখন দেওয়াল যাবে ভেঙ্গে, ছাদ মাথায় পড়বে। আমি ভাবছি মাথায় ছাদ ভাঙলেও মোবাইলটা যেন আস্ত থাকে। সব ছবি ওতে আছে।

ছাদ থেকে কলের মতো জল পড়ছে

একে তো ঠাণ্ডা, তার ওপর বৃষ্টি। পাগল ছাড়া এই দুর্যোগে অন্ধকারে কেউ ছাদে উঠে নাকি! কিন্তু ছাদটাকে তো বাঁচাতে হবে। লালুজী করল কি, কোন জায়গায় জলটা আছে জিজ্ঞাসা করল। তারপর একটা লোহার রড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছাদটা ফুটো করে দিল। আমি তো দেখে অবাক, ঘরের মধ্যে বসে ঘরের ছাদ ফুটো চলছে। তারপর হঠাৎ দেখি সেখান দিয়ে তোড়ে জল পড়তে লাগলো। কলের মুখ দিয়ে যেমন জল পড়ে। তলায় একটা বড় বালতি (২০ লিটার) ধরা হল, নিমেষে ভর্তি হয়ে গেল। আর একটা বালতি রেখে সেটার জল বাইরে ফেলা হল। এই করে প্রায় ৪০ বালতি ফেলার পর মাসি গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, তিনি ছিলেন বলে আমরা এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। নাহলে ছাদ চাপা পড়ে মরতাম। আমি ভাবছি মরতে এখনও পারি, জলের তোড় তো কমেনি। যাইহোক মোটামুটি ৫০ বালতি ফেলার পর আস্তে আস্তে জলটা কমতে লাগলো। তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে হল না। বালতিটা রেখে জল ভরতে দেওয়া হচ্ছে। আমরা গল্প করছি আর তাকিয়ে আছি। 

বালতি ভর্তি হলে কেউ একজন উঠে সেটা ফেলে দিয়ে আর একটা বালতি রাখছে। তবে আমি হলাম অতিথি। আমাকে তারা সে দায় থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু এভাবে বসে বসে দেখতেও কেমন লাগছে। মনে আছে, একবারই উঠে জল ফেললাম বটে তবে ঠাণ্ডায় জমে যাবার জোগাড়। বুঝলাম এ আমার কম্ম নয়। সেই যে বসলাম আর উঠিনি। এরই ফাঁকে খাওয়া দাওয়া সারা হল। সময়ের সাথে সাথে বালতির জল ফেলার সংখ্যা কমলো।

বৃষ্টি তো পড়েই চলেছে। এখানে বৃষ্টির ধরনটা অন্যরকম, ঝম্‌ঝম্‌ করে হয়না। গুটিগুটি করে পড়তেই লাগে, বন্ধ হয়না। ফোঁটার আকার বড়। দু এক ফোঁটা গায়ে পড়লে জামা ভিজে যাবে। তাহলে তো সারারাত ছাদ দিয়ে জল পড়তেই লাগবে। আমি বললাম তাহলে আমরা পালা করে জাগি, প্রত্যেকে দু ঘণ্টা করে। তারা বলল, “স্যারজী, আপনি নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ুন। আমরা থাকতে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আমরা হচ্ছি লেবার। এই হল লেবারদের জীবন। আমরা এতে অভ্যস্ত। বছরে নয় মাস এইভাবে খেটে তিন মাস বাড়ি যাই টাকা নিয়ে। আমাদের কষ্ট কেউ বুঝবে না”। লালুজী বলল সে একাই সারারাত জল ফেলবে। কারুর জাগার দরকার নেই। বাকি দুজন দেখি দিব্যি শুয়ে পড়ল। উপায় না দেখে আমিও চোখ বুঝলাম।

মাঝরাতে হঠাৎ কিসের একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি লালুজীও ধড়মড় করে উঠেছে। অন্ধকারে কিছু বুঝতে পারছি না। টর্চের আলোটা জ্বাললাম। দেখি দরজার ওপরে দেওয়ালের মাটি খসে পড়েছে। ওই অংশে এক ফুটের মতো লম্বা ফাটল ধরেছে। জল ঢুকছে ওই চেরা জায়গা দিয়ে। সে তড়াক্‌ করে লাফিয়ে উঠে জল ফেলতে গেল। আমি বুঝতে পারছি না এর পরিত্রাণ কী। তিনি ছাদের গর্তটা খোঁচাখুঁচি করে আরো বড় করে দিলেন। কোনোভাবে জলটা আটকে গিয়েছিল। আরো দ্রুত গতিতে বালতি ভর্তি হতে লাগলো। খানিকটা জল বের হবার পর দেওয়াল বেয়ে জল পড়াটা কমলো। সে বলল, “বরফ পড়তে শুরু হয়েছে স্যারজী। এখন জল কম পড়বে। আপনি শুয়ে পড়ুন, আমি জেগে আছি”। বিছানাটা বেচারা একটু উল্টিয়ে পাল্টিয়ে নিল। সেই যে বরফ পড়া শুরু হল আর কমলো না।

পরদিন ঘুম ভেঙ্গে কাঁচের জানলা দিয়ে দেখি চারিদিক সাদা বরফে মোড়া। বরফ পড়ে চলেছে। জমি, পাহাড়, আকাশ সব এক, সব সাদা। আলাদা করে কিছু চোখে পড়ছে না। সকালে রান্নাবান্না করে কিশোরজী বলল শহর দেখতে বেরোবে। আমার তো বেশ মজা। ঘরে বসে থাকতে কার আর ভাল লাগে। দুজনে মিলে বরফের ওপর ঘুরে ঘুরে ছবি তুললাম। তার পুলক আর ধরে না। আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি বিয়ার খাবো কিনা। বুঝলাম এই পরিবেশে তার মনে নেশার ইচ্ছে

 জেগেছে। আমি বাধা হয়ে দাঁড়ালে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। খুশি করতে বললাম চলো, একটু বিয়ার খাবো। আমি জানতাম, আমার এই বিয়ার খাওয়াটা তাকে মদ খাবার অনুমতি দেওয়া। তার তো ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। সোজা চলল দোকানে। রাস্তাঘাট সব বরফে ঢাকা, গাড়িঘোড়া নেই, দোকান সব বন্ধ। কিছু মানুষ আমাদের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে। আর কিশোর হন্যে হয়ে মদের দোকান খুঁজে চলেছে। কিন্তু পাবে কোথায়, সব তো বন্ধ। শেষে একটা যাও বা পেল, সেখানে বসে খেতে দেবে না। কারণ এখুনি সে বন্ধ করবে, ছাদ দিয়ে জল পড়ছে। অগত্যা একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল জোগাড় করে তাতেই দু পেগ মদ ঢেলে নিল। বলল কোথাও বসে খাবে। আমি বললাম সেই ভাল। চলো বাড়িতে আরাম করে খাবে। আমার জন্য নেওয়া হল একটি বিয়ারের ক্যান। বললাম সব দাম আমি দেব। সে খুব খুশি।

নেপালি গুমটি

বাড়ি না গিয়ে সে ঢুকল একটি নেপালি গুমটিতে। এখানে নালার ধারে অনেকগুলো ছোটো ছোটো নেপালি দোকান (গুমটি) আছে। একটিতে ঢুকে একবাটি মাংস চাইল, বলল আমার জন্যে। তবে আমার মাংসের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তাকে বললাম খেতে। মাংসের সাথে সে নিমেষে দু পেগ ঢক ঢক করে গিলে নিল। তারপর বলল আবার মাংস নেবে। আমি বললাম আমার দরকার নেই। তোমার ইচ্ছে হলে নাও। সে নিল এবং স্থানীয় মদ নিল এক গ্লাস। প্রতি গ্লাস পঞ্চাশ টাকা। এক গ্লাস 

মানে মোটামুটি আড়াই পেগের সমান। তারপর চলল চকের (রাস্তার মোড়) দিকে আড্ডা দিতে। সেখান থেকে একটু পড়ে ফিরে এসে আবার ঢুকল নেপালি গুমটিতে। আবার এক গ্লাস। কিশোর আমার অপরিচিত, আমি তার আশ্রিত। আমার উচিত নয় তাকে উপদেশ দেওয়া। শেষে দেখলাম তার চোখমুখ নেশায় আচ্ছন্ন। জুতোয় জল ঢুকেছে এই অজুহাতে বললাম চলো ঘরে যাওয়া যাক। পরিবেশটা আমার জন্য মানানসই নয়। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু যাবো কী, সে তো আর হাঁটতেই পারছে না। আমি একটু এগিয়ে এগিয়ে চললাম তার দিকে নজর রেখে। সে আমার দিকে নজর রেখে প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলো।

ঘরে এসে বাকি দুজনকে দেখে যা বুঝলাম, ওরা এটা দেখতে অভ্যস্ত। কোনো হেলদোল দেখলাম না তাদের। তবে আমার সম্মানে এক কাপ চা পেলাম। সোয়াবিন নাগেটের তরকারি করে রেখেছে সূর্যের আলো থাকতে থাকতে। বিদ্যুৎ নেই, অন্ধকারে খেতে হল। কিশোর খাবার মতো পর্যায়ে নেই। লালুজী আমাকে শুয়ে পড়তে বলল। তারা সারারাত বালতির জল ফেলবে।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে কেমন যেন সন্দেহ হল। চারিদিক নিস্তব্ধ। লালুবাবু দিব্যি ঘুমোচ্ছে। বাকিরাও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। টর্চ মেরে দেখি টস্‌ টস্‌ করে জল পড়েই চলেছে। মনে খটকা লাগলো, তাহলে কি ওরা বালতির জল ফেলছে না? দেখি সত্যিই তাই। বালতি জলে টইটম্বুর, উপছে জল গড়িয়ে মেঝেতে। আমার মালপত্তর ভিজে গেলে তো সর্বনাশ। বিছানা ভিজলেও সর্বনাশ। আমি অসুস্থ হয়ে যাবো। মাটির মেঝে, কতটা ভিজেছে ভাবার সময় নেই। এক ঝটকায় স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়ে বালতির জল বাইরে ফেলে আবার জলের তলায় রাখলাম। বাকিরা তাতেও নির্বিকার। অর্থাৎ আমি না ফেললে সারারাত তারা ভিজের ওপরে শুয়ে থাকত। আবার অন্যভাবে ভাবলে, কতটা ক্লান্ত থাকলে মানুষ এই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়তে পারে। যদিও মাটির ওপর আমাদের সবার নিচেই পলিথিন পাতা, তার ওপর বিছানা। দেখলাম লালুজীর জায়গাটা জলে ভিজেছে। কিন্তু বাকিটা তখনো শুকনো আছে। আমি বালতি কখন ভর্তি হয় তা লক্ষ্য করতে লাগলাম। হঠাৎ কিশোরের ঘুম ভাঙল। সে দেখি তড়াক করে উঠে এক বালতি জল ফেলল। আবার শুয়ে ঘুমের গভীরে চলে গেল। আবার আমি বালতির দিকে তাকিয়ে। এরপর লালুবাবুর ঘুম ভাঙল। বেশ বালতিটা ভর্তি হচ্ছে আর এক এক করে ঘুম ভাঙছে। হিসেব করে দেখলাম এক বালতি জল ভরতে লাগছে আধ ঘণ্টা। সে উঠে এক বালতি ফেলে বেশ লজ্জার সঙ্গে বলল কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি বললাম সেটাই তো স্বাভাবিক লালুজী। কারো একার পক্ষে সম্ভব নয় জল ফেলা। তবে এবার সে আমাকে অভয় দিল আর ঘুমবে না। আমাকে শুয়ে পড়তে বলল। নিজের কম্মের দায় কাকে আর দেবে।

আমি শুলাম বটে তবে চোখে ঘুম এলো না। সারারাত দেখতে লাগলাম বালতিটা ভরে গেলে সে ফেলে কিনা। আর যাই হোক আমি জলের ওপর শুতে পারব না। এই করতে করতে ভোর হয়ে গেল। মনে হল বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে। আমি গেলাম বাথরুমে। যেই না বাইরে গিয়েছি দেখি চারিদিকে কোলাহল। মাসি আমাকে বলছে কিশোরকে ডেকে দিতে। তারা তাদের দোতলার ছাদে উঠে বেলচা দিয়ে বরফ ফেলছে। আশেপাশের বাড়ির সবাই দেখি ছাদে। তারাও বরফ ফেলছে। কিশোরকেও বরফ ফেলতে হবে, মাসি তাকে ডাকছে। কিশোরকে ডাকলাম কিন্তু তারা কেউ সাড়া দিল না। স্বাভাবিক, সারারাত জল ফেলে সকালে ওঠা অসম্ভব। বেগতিক দেখে আমি আমার বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

প্রায় আধ ঘণ্টা পর এদের ঘুম ভাঙল। যেই না কিশোর বাইরে গেছে, দেখি মাসি খেঁকখেঁকিয়ে কিশোরকে কী সব বলছে। বেশ বকুনি দিচ্ছেন মনে হল। ও দেখলাম মুখ বুজে সব সহ্য করছে। ভাড়াটে হলে কথা শুনতে হয়। কিন্তু ওর ভয়ডর নেই। পাল্টা ইয়ার্কি মেরে ঘরে এলো। বলল বরফ ফেলতে হবে। তারপর তিনজন মিলে ছাদে উঠে বরফ ফেলতে লাগলো। আমি ঘাপটি মেরে ঘরেই রইলাম। আমাকে দেখে মাসি না আবার খেঁকখেঁকানি শুরু করে। বেশ ঘণ্টা খানেক বাদে তারা নেমে এসে বলল সব বরফ ফেলে দিয়েছে। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম আর ভাবলাম, ছাদে প্রচুর বরফ ছিল। ফেলাটা জরুরী ছিল।

আজ শালাবাবুরও মনটা দেখি ভাল। কাল কার ওপর যে অভিমান হয়েছিল জানিনা। টাকা নিয়ে বলছিল বাড়ি চলে যাবে, কিছু খাবে না। লালুজী অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে খাইয়েছে। আজ নিজে নিজেই কাজ করতে শুরু করল। পলিথিন সরিয়ে ঘরে কাজ করতে লাগলো। আমার জুতোটাকে সে ছাড়ছে না। ফলে আমি ঘরে গেছি আটকে। তবে তাদের খুশি দেখতে আমার ভাল লাগছে।

একটু পর বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। বাড়িওয়ালীর ছেলে বলল কাল রাস্তা খুলে যাবে। পরশু মানালির দিকে যাওয়া যাবে। মনটা খুশিতে টগমগ হয়ে উঠল। যত ঝামেলা বৃষ্টির জন্য। ঠাণ্ডা তাও সামলানো যায়। কিন্তু সে সুখ বেশিক্ষণ সইল না। আকাশের মুখ ভার করে এলো। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল। ঘরে বসে আছি। ভাবছি এভাবে বসে থাকা অসম্ভব। বেচারারা কাজে যেতে পারছে না। ওদের রোজগার বন্ধ। ভাবছি বি.আর.ও. গেস্ট হাউসে চলে যাবো। ঘর জুড়ে বসে আছি। আমার জন্য এদের কষ্ট দেখে সহ্য হচ্ছে না। কথাটা পাড়তে কিশোর বলল বি.আর.ও. গিয়ে লাভ নেই। রোদ উঠলে তাদের আর সমস্যা নেই। বুঝলাম আমাকে অপাঙতেও ভাবছে না তারা।

কিশোরের বাড়িওয়ালীর বাড়ি

স্থানীয় মানুষদের কথা ভাবছি। শহর স্তব্ধ। কার্গিল, লেহ্‌, মানালি যাবার পথ বন্ধ। খুললে কার্গিল আগে খুলবে। ততদিন এরা বন্দী। এদের অনেকের ঘর ভেঙ্গে গেছে। কাল সকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য এখানের সব বাড়ি মাটি দিয়ে তৈরি। অগস্ট মাসে এই নাকি প্রথম এত বৃষ্টি হল। প্রচুর স্থানীয় বাড়ি ভেঙ্গে গেছে। এবার এদের সময় এসেছে ইটের বা সিমেন্টের বাড়ির কথা ভাবার। আমি যে বাড়িটায় আছি, বাড়িটা তৈরি করতে পারেনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখি ছাদে যেমন

তেমন করে মাটি ফেলে দিয়েছে। কর্দমাক্ত মাঠের মতো দেখতে লাগছে। বরফ গলে জল হচ্ছে কিন্তু বেরোবার জায়গা পাচ্ছে না। তাই এত বিপত্তি। বাকিদের ছাদের নল দিয়ে দিব্যি জল গড়াচ্ছে। আমি বুদ্ধি দিলাম, যেমন করে বরফ ফেলা হল, একটা মগ দিয়ে তেমন করে জলটা ফেলে দিলেই তো হয়। ছাদ ফুটো করার দরকার নেই, ছাদের চাপ কমবে। কিশোরের মনে ধরল কথাটা। লালুজী সেইমতো জল ফেলতে লাগলো। আমিও হাত লাগিয়ে ধন্য হলাম।

দুপুরে খেয়ে দেয়ে শুরু হল নগর পরিক্রমা। ঘুরে ফিরে কিশোর নেপালি দোকানেই গিয়ে ঢুকল। সেখানেই তার বেশি পছন্দ। এক ভদ্রলোক কাঠের আগুন জ্বালিয়ে তাপ পোহাচ্ছে। তিনি একসময় কোলকাতায় ছিলেন। ফলে আগুনের একটু কাছে যেতে পেরেছি। পাশে তার বউ আগুন পোহাচ্ছে। সে আগুনটাকে তার দিকে টেনে নিচ্ছে বারবার। আর কিশোর এসে আগুনটাকে আমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে – স্যারজী বলে কথা। দেখি রেগে মেগে সেই বউ আগুনটাকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। কিশোর আর কী করে। আমাকে নিয়ে চলল পাশের ঘরে। সেখানে একটা হোটেল চলে। লোকেরা বেঞ্চিতে বসে খায়, তবে বেশীরভাগই মদ্যপান করে। আমিও গিয়ে সেখানে আগুনের পাশে বসলাম। খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট বসেছি। 

মাথার ওপরের একটা কাঠের বিম্‌ (Beam) ভেঙ্গে পাশে পড়ল। কিশোর ধরেই নিল আমার মাথায় পড়েছে। পাশের ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল লেগেছে কিনা। আমি ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বললাম কিচ্ছু হয়নি আমার। আসলে কিশোরের একটা দায় আছে। বলল, “আপনার কিছু হলে আজ পুরো দোকানটা ভেঙ্গে দিতাম”। বললাম তা কেন, ওরা কি ইচ্ছে করে করেছে? বাইরে নিয়ে গিয়ে সে বলল, “দেখুন,

ছাদে একটা মোটা লোক তুলেছে, সে বরফ কাটছে। তার কোনো বোধ নেই, জানেনা কোথায় চাপ দিতে হবে”। এদিকে সত্যিই তার কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই। ছাদটা যে ভেঙ্গে গেছে তাও তার খেয়াল নেই। তখনো সে বরফ ভেঙ্গে চলেছে।

ঘরে আগুন পোহানো

আমি দেখলাম কেটে পড়াই মঙ্গল। নাহলে সবকটা একসাথে মরবো। কিশোর বলল চলুন, আপনাকে আজ ঘরে আগুনের ব্যবস্থা করে দেব। ঘরে লালুজী, শালাবাবু রান্না চাপালো। কিশোর ধরালো আগুন। সে আগুনের ধোঁয়ায় ঘর গেল ভরে। আমার দম বন্ধ, তারা দিব্যি বসে আছে। বললাম আর পারছি না, আগুন নেভাও। না নিভিয়ে কিশোর দরজাটা দিল খুলে, দরজা দিয়ে বাতাস প্রবেশ করল। বিজ্ঞানের প্রয়োগ – ধোঁয়াটা রয়ে গেল সিলিং’এ। আমরা নিচে বসে রইলাম শুদ্ধ বাতাসে।

পরদিন সকালে একদম রৌদ্র ঝলমল আকাশ। মনোস্থির করতে পারছি না কী করা উচিত। চণ্ডীগড় থেকে ট্রেন ধরতে গেলে আমাকে মানালি আর দুদিনের মধ্যে পৌঁছতে হবে সাইকেলে করে যা কার্যত অসম্ভব। অতএব গাড়ির খোঁজ আজ করতেই হবে। ওদিকে রোদ উঠলেও কিশোররা আজ কাজে গেল না। আমি চাইছি কাজে যাক। কাজ করলে মন ভাল থাকে। আমার পাল্লায় পড়ে আমার রোগে না ওদের পেয়ে বসে। খেয়ে দেয়ে বেরোল নগর পরিক্রমায়। চকে যেতেই ট্যাক্সি অপারেটর আমাকে দেখে সাইকেলওয়ালা বলে চিনতে পারলেন। প্রথমদিন অনেকক্ষণ দেখেছিলেন গাড়ির খোঁজে হাঁকুপাকু করতে। বললেন গাড়ি ছাড়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্তত তিন – চারদিন অপেক্ষা করতে হবে।

ট্যাক্সি স্ট্যান্ড

কিশোর বলল চলুন ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে যাই। বুদ্ধ চক্‌ থেকে ডানদিকে রেডিও স্টেশনের পাশ দিয়ে সোজা গেলে বিরাট ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। এই পথেই সোজা চলে গেলে কারশা গোম্ফা। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে মাত্র তিনটে ট্যাক্সি, তারা অন্য কারণে দাঁড়িয়ে। একজন বলল রাস্তা ঠিক হলে কালকে ছাড়তেও পারে, ফোন করে জানিয়ে দেবে। ফলে আর কোনো কাজ নেই বাড়ি ফেরা ছাড়া। ফিরে একটা মস্ত কাজ হল। ঘরের মেঝেতে পাতা যত পলিথিন, বিছানার চাদর, কম্বল এবং জামা, প্যান্ট, জ্যাকেট যা কিছু ঘরে ছিল সব রোদে শুকোতে দেওয়া হল। আমি লেগে গেলাম জামাকাপড় কাচতে এবং স্নান করতে। খোলা আকাশের নিচে স্নান করতে করতে মাসি এসে হাজির। ঢুকেই বলল পরেরবার থেকে আর ভাড়া দেবেনা কিশোরকে। কোন এক দোকানদারকে ভাড়া দেবে। আমি খালি গায়ে গামছা পরে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছি, ভাবছি কি হল আবার! শুনলাম, আমি নাকি স্নান করছি তাই ওদের ড্রাম ভর্তি হয়নি। আমি কল থেকে যে নলটা খুলে স্নান করছি, সেই নলটা দিয়ে ওদের জল ভরে। আমি আতঙ্কিত হয় পড়লাম, আমার জন্য এ বেচারাদের না ভুগতে হয়। আমার কি দোষ। কিশোররাই তো আমাকে এই কলে স্নান করতে বলেছে। কিশোরদের দেখলাম কোনো হেলদোল নেই। মাসি একটু খ্যাপাটে রাগী। তিনি যে বাড়িওয়ালী তা কথায় কথায় বুঝিয়ে দেন।

দুপুরে বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোনো হল। কোথাও কোথাও চুপচাপ বসে থাকা (পাড়ার মোড়ে আড্ডা মারার মতো), আবার একটু হেঁটে বেড়ানো। মন্দ লাগছে না এই জীবনটা। তবে কিশোরের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হল নেপালি দোকান। ঘুরে ফিরে সে এখানেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অনেকগুলো নেপালি দোকান আছে, তার মধ্যে মুটিদিদির (মোটা চেহারা বলে এরকম নাম) দোকানটাই তার সবচেয়ে পছন্দের। সে নাকি সবচেয়ে পুরনো। কিশোর এখানে আছে নয় নয় করে চার বছর। মুটিদিদি তখন থেকেই আছে। তার সাথে কিশোরের ভাল সম্পর্ক। তখন মাত্র তিনটে দোকান ছিল। বাকিগুলো সব দু-বছরের বেশি নয়। ফলে এখানে কিশোরের ভালই দাপট। স্থানীয়দের ওপরেও সে মাঝে মাঝে চোটপাট করে। সবাই তার চেনা। সবার সাথে সে কথা বলে। এটা একটা বড় গুণ। আজ মুটিদিদির দোকানে সে দু-গ্লাস মদ্যপান করল। আমি বললাম, “কিশোর, আমি তোমাকে জ্ঞান দিতে চাইনা। তবে তুমি তো রোজই মদ খাও। তোমার উচিত একটা সীমা রেখে খাওয়া। তাহলে দেখবে মদ তোমাকে খাবে না”। আমার কথাটা তার বেশ মনে ধরল। বলল চলুন স্যারজী, ঘরে যাই।

ঘরে আরাম করে বসে সবাই গল্প করছি। একটা ফোন এলো এবং হল বিপদ। কিশোর সেই যে গেল, আর এলো না। এদিকে লালুজী ও শালাবাবু চারজনের জন্য আটটা ডিমের ঝোল বানালো। অন্ধকারে লালুজী আমার সাথে প্রাণের গল্প করতে লাগলো। আজ লালুজী আমাকে অনেকক্ষণ একা পেয়েছে, এতদিন কিশোর সঙ্গে সঙ্গে ছিল। ফলে আজ তার সাথে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হল। বললাম যেদিন সুযোগ পাবে কোলকাতা চলে এসো, আমার বাড়ি থাকবে। এরপর তারা বলল খেয়ে নিতে। আমি বললাম কিশোর আসুক। শালাবাবু বলল “বেশ”, বলে শুয়ে পড়ল। লালুজীও তার পাশে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আমি একা একা বসে রইলুম টর্চ জ্বেলে। মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধছে কিশোর আসছে না দেখে। ব্যাটা মদ গিলছে না তো? আবার ভাবছি নির্ঘাৎ কোনো জবরদস্ত কাজে ফেঁসে গেছে।

বেশ রাত হয়েছে, ন’টা তো বটেই। বাইরে বেরিয়েছি বাথরুমে যাবো বলে। দেখি বাড়িওয়ালার দরজার সামনে একটা ছোট্ট আলো জ্বলছে। সেটা এগোচ্ছেও না, পেছোচ্ছেও না। তবে সেটা যে মোবাইলের আলো বুঝতে পারছি। একটু পর কেউ মোবাইলে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে টলতে টলতে। নিজের রাস্তাই সে চিনতে পারছে না। বরফের ওপর বসে পড়তে পড়তে আবার হাঁটছে। কিশোর ছাড়া আর কে হতে পারে। সিঁড়ির কাছে এসে কাকে কী যেন বলছে বুঝতে পারছি না। ভাবলাম লালুদের ডাকছে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে যাবার জন্য। আমি তড়িঘড়ি করে নেমে তাকে ধরতে যেতেই সে একটা ঝটকা মারল। আমি ভয়ে সরে গেলাম। ফোনটা আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বলল কথা বলতে। কার ফোন, কেন ফোন কিছুই জানলাম না, বোকার মতো ফোনটা ধরলাম। ওপার থেকে কেউ বলল আমার সাথে কথা বলবে না। কাল কিশোর যেন তাকে সকাল আটটায় ফোন করে। শুধু এটুকু জানলাম কাল সে সকালে জানাবে গাড়ি পেল কিনা। বুঝলাম ওটা আমার গাড়ির জন্য ফোন ছিল। এক ঝটকায় প্রথম যেটা মনে এল, আমার এখানে থাকার দিন শেষ। কেমন একটা একাত্ম হয়ে গেছিলাম এই ক’দিনে। কিন্তু ভুলে গেছিলাম মূলমন্ত্রটি – “শুধু যাওয়া আর আসা”। ক’দিনের জন্যই বা পৃথিবীতে আসা। চলে যেতে হবে সব ছেড়ে। মায়া বড় বিষম জিনিস, দুঃখ ছাড়া কিছুই দেয়না। পাশাপাশি এটাও ভাবলাম, আমি কি তবে তাদের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে উঠেছি? গাড়ির খোঁজ করছে যে তারা?

কিশোর টলতে টলতে ঘরে ঢুকল। সে দু’জন আর উঠল না। কাঁপা কাঁপা হাতে কিশোর একাই খাবার গরম করল। স্টোভের ওপর বসাতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। আমি ভাবলাম রাতের খাওয়াটাই গেল বোধহয়। ভাত বাড়ার আগে মনে করে থালাটা ধুলো। শশা কাটতে ভুলে গিয়েছিল। আমি বললাম থাক না, ছাড়ো। সে ছাড়ল না, ধুয়ে কেটে পাতে দিল। আমি খেতে লাগলাম, সে ভাতটা নাড়তে লাগলো। মুখে আর তোলে না। অনেকক্ষণ দেখার পর আমি বললাম কী হল কিশোর? তোমার খেতে ইচ্ছে করছে না? উত্তরে সে বলল, “ক্ষমা করে দেবেন স্যারজী। জীবনে আর এ ভুল করব না”। চোখটা তার ছলছল করছে। আমি মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম, এই যে তুমি ভুল স্বীকার করছ, তোমার ভুল শুধরে গেছে। ঈশ্বর তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছেন। বুঝলাম অনুশোচনায় সে খেতে পারছে না। কাল বলেছিলাম নিজের সীমা রেখে মদ খাবে আর আজই সীমা অতিক্রম করবে সে নিজেও ভাবেনি।

খাওয়া শেষে থালাটা পর্যন্ত ধুতে দিল না। বলল আপনি শুয়ে পড়ুন, অনেক রাত হল। আমি বললাম ওই দুজন? ওরা তো কিছু খেল না। ঘাড় নেড়ে বলল জানেনা। ওরাও উত্তর দিল না। ওদের কি ঝগড়া হয়েছে? নাকি বনিবনা নেই? কিছুই বুঝিনা। কাল লালুজী বলছিল এখানে থাকবে না, কাশ্মীর চলে যাবে। ওখানে আবহাওয়া ভাল। নাকি আজকে কিশোরের এই মদ খাওয়াটা পরিবেশ নষ্ট করেছে বলে ওরা নিতে পারেনি, মটকা মেরে পড়ে আছে। আগেও একদিন এরকম হয়েছিল। শালাবাবুর নামে সমালোচনা করছিল দুজন আর শালাবাবু মটকা মেরে পড়েছিল। আমি বাথরুমে যেতেই সে রুদ্রমূর্তি। বলে টাকা মিটিয়ে দিতে, বাড়ি ফিরে যাবে। আজও জানিনা সেরকমভাবে তারা পড়ে আছে কিনা। কার যে কে শত্রু মিত্র বোঝা দায়।

তবে কিশোরের একটা বেশ কম্যান্ড আছে। সবকিছু কম কথা বলে সামলায়। তবে আজ সে নিজেই বেসামাল। তবু আমার সম্মান রক্ষায় সে সদা ব্যস্ত। আমি শুতে গেলাম। আমার জায়গায় মাটিতে শুধু পলিথিন পাতা ছিল। বাকিদের সবার নিচে কম্বল। শালাবাবু রোদ্দুর থেকে তুলে আমার জায়গাটা ছেড়ে কম্বল পেতেছিল। সেটা তখনই দেখেছিলাম, কিছু বলিনি। একটু অভিমানও হয়েছিল, কেন এমন করবে সে? তার ওপরেই স্লিপিং ব্যাগে ঢুকলাম। কিশোর এই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কী করে লক্ষ্য করল জানিনা। আমাকে তুলে নিজে হাতে কম্বল বিছিয়ে দিল। এরপর বউয়ের সাথে আবেগঘন গল্প শুরু করল। সে কথা শুধু স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যেই চলে। আমার পাশেই সে শুতো। ফলে বউয়ের কথাও সব শুনতে পাচ্ছি। তিনি বেচারি বছরে তিনমাস মাত্র স্বামীকে কাছে পান। রোজ গতানুগতিক কথা হয়। আর আজ এমনভাবে বরকে কাছে পেয়ে ছাড়তে চায় না। তাঁরও সখ আল্লাদ আছে। এদিকে কিশোর ভুলে গেছে যে আমি তার পাশে আছি। আমার পক্ষে উঠে যাওয়াও সম্ভব নয়।

আমি চোখ বুঝে একটা সুন্দর পৃথিবী খুঁজে পেলাম যেখানে সবাই সুখী হতে চায়, কেউ সুখী হয় কেউ হয় না। কিশোরের মধ্যে একটা মানুষ খুঁজে পেলাম এখানে না থাকলে যেটা সম্ভব হতো না। আমি যে অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াই, তার কারণও এটাই। ভাল মন্দ কত রকমের মানুষ এই পৃথিবীতে আছে, কুয়োর মধ্যে আটকে থাকা মানুষজনের পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। বইয়ের পাতাতেও এদের কথা লেখা থাকে না। আমার কাছে সুযোগ আসে এদের গভীরে ঢোকার। এদের সাদা কাল মনের ভেতরে যে রঙিন মন লুকিয়ে আছে তা জানার। বারবার প্রমান পাই, এক ঝলকে যে মানুষগুলোকে আমরা দেখি, তার ভেতরের মানুষটাকে খুঁজে পেতে গেলে লাগে সময়। সেটা দিই না বলেই যত গণ্ডগোল। পরদিন তাকে কিন্তু কিন্তু করে বলি, এতদিন থাকলাম, তোমাদের খরচা হয়েছে অনেক। সামান্য কিছু টাকা রেখে দাও, আমার সাধ্য মতো দিচ্ছি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল, “স্যারজী, টাকা কি দিতেই হবে? যদি কখনও বিপদে পড়ে আপনাকে বলি এই ভাইকে পাঁচশ – হাজার টাকা পাঠাতে, আপনি পাঠাবেন না? টাকা কতদিন? সম্পর্ক তো চিরকাল বেঁচে থাকে”। আমি অবাক হয়ে কিশোরের দিকে তাকিয়ে বললাম, অনেক বড় কথা বলেছ কিশোর। তোমার থেকে লেখাপড়া আমার বেশি হতে পারে, শিক্ষা আমার চেয়ে তোমার বেশি। 

পরের কথা পরে হবে, সে বড় দীর্ঘ ইতিহাস। এটুকু জানাই, পরেরদিন আমি গাড়ি না পেয়ে সাইকেলেই যাত্রা শুরু করতে বাধ্য হই এবং কয়েকদিন বাদে সুউচ্চ সিঙ্কুলা পাস অতিক্রম করতে সমর্থ হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছই।

Similar Posts

  • শ্রী অমরনাথ যাত্রা – অন্য চোখে

        দুই হাজার চব্বিশ (২০২৪) সালের শ্রী অমরনাথ যাত্রার শুভ সূচনা ২৯’শে জুন তারিখে। আমি আজ ২৮’শে জুন অর্থাৎ যাত্রার একদিন আগে জোজিলা পাস দিয়ে অবতরণ করছি। আমি ছিলাম লাদাখে। দ্রাস থেকে জোজিলা পাস অতিক্রম করে চলেছি শ্রীনগরের দিকে। আমার বাহন সাইকেল। এই সাইকেলে ভ্রমণের কারণে পথে বহু মানুষের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ে। দৃশ্যপটও…

  • উধমপুরের উধমসাধু

    উধমপুরের সাধুবাবা                             ২০২৪ সালের জুন মাসের ঘটনা। চলেছি মানালি থেকে লাদাখ। সেখান থেকে কাশ্মীর হয়ে জম্মু। পুরোটাই সাইকেলে। যাত্রার একেবারে শেষ দিকে এসে পৌঁছেছি। দু-দিন মাত্র বাকি। আজ আছি ‘পাট্‌নি টপ’এর কাছে ‘বাটোট্‌’ বলে একটি জায়গায় এক পূর্ব পরিচিত সর্দারজী’র বাড়ি। সেখান থেকে ৬ কিমি ওপরে উঠতে পারলেই…

  • কাটোয়া-লাডপুর-চন্ডিদাস-বোলপুর

    কাটোয়া-লাডপুর-চন্ডিদাস-বোলপুর কাটোয়া স্টেশনের পরে যে রাস্তাটা “কেতুগ্রামের” দিকেগেছে, সেটির দুপাশে শুধুই ধানক্ষেত। এখানের সবচেয়ে বড় নদী ‘অজয় নদ’ একটু দূরেই গঙ্গারসাথে মিশেছে। কেতুগ্রামে “গীতাভবন” বলে একটিআশ্রম আছে আমার পূর্ব পরিচিত। দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে সেখানে দেখি নাচ গানের মহড়া চলছে।তাদের একনিষ্ঠ অনুশীলনে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।সেখানে পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঈশানী নদী। সেখানে বাচ্চাদের কতই না কেরামতি।…

  • বিদ্যুৎ মহারাজ

    বিদ্যুৎ মহারাজ বিদ্যুৎ মহারাজের সন্ন্যাসে রূপান্তরের গল্প   চলার পথে পড়ে থাকা সম্পদ যা কিছু চোখে পড়ে, তা চাক্ষুষ করে আমার জীবন সার্থক হয়। কোন পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এসব সম্পদ আমার কাছে ধরা দেয়। যেমন বনগাঁ ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিদ্যুৎ মহারাজ। সাধারণ একটি পরিবারের সন্তান হয়ে কিভাবে তিনি ধীরে ধীরে একটি সংঘের মহারাজ হয়ে উঠলেন, তাই…

  • জোজিলার কালো রাত

    জোজিলার কালো রাত সে একরাত বটে। রোদ ঝলমলে সকালে টেন্টের দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি চারিধারের পাহাড়ের মাথায় সোনালী সূর্যের ছটা। সোনামার্গের যাত্রীনিবাসে মনোরম ঘাসের ওপর টেন্ট খাটিয়েছিলাম। সাইকেল চালিয়ে চলেছি লাদাখ। সোনামার্গের পরে বড় শহর হল দ্রাস। পথে আছে ‘জোজিলা পাস’ (৩৫২৮ মি. উঁচু)। এর আগে পাসের প্রকৃতি সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল…

  • একটি চুরি যাওয়া সাইকেল

    একটি চুরি যাওয়া সাইকেল পর্ব – ১ আমি চলেছি জম্মু থেকে কাশ্মীর, তাও আবার সাইকেল চালিয়ে। যাবো লাদাখ। যারা গেছে তারা জানে, জম্মু থেকে কাজিগান্ড পর্যন্ত ১৭৫ কিমি রাস্তা বরাবর উঁচু। যেখানে দেখে মনে হয় রাস্তা উঁচু নয় সমান্তরাল, সেখানেও রাস্তা সামান্য উঁচু। সে উঁচু চোখে দেখে বোঝার উপায় নেই। গাড়িতে গেলেও বোঝার উপায় নেই।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *