একটি চুরি যাওয়া সাইকেল

একটি চুরি যাওয়া সাইকেল

পর্ব – ৪ (শেষ পর্ব)

এদিকে আমার হাল কে দেখে তার ঠিক নেই। এসব করতে করতেই বেজে গেল বিকেল ৪’টে। কোর্ট নাকি ৪’টে অবধিই চলে। উকিলবাবু আমার সব কাগজপত্র বের করে চললেন জজ্‌ সাহেবের কাছে। নিয়মটা আগেই বলেছি, কোর্ট কিছু একটা অর্ডার দেবে। সেটা নিয়ে থানায় আসতে হবে। সেখানে থানায় সই করে দিলে সেই কাগজ নিয়ে আবার কোর্টে আসতে হবে। সে সময় আজকে নেই। তাই উকিলবাবু নেট থেকে আমার FIR কপি ডাউনলোড করেছেন। বললেন, যদি জজ্‌ সাহেব জিজ্ঞাসা করেন তো বলবেন যে FIR কপিটা থানা থেকে এনেছেন। (বুঝলাম ওটা থানাতে গিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপার ছিল)। আমি বললাম বেশ তাই হবে। উনি ওনার মতো করে অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু জজ্‌ সাহেব রাজি হলেন না। তিনি বললেন থানা থেকে একটা নির্দিষ্ট বয়ানে চিঠি আনতে যেটা থানা জানে যে কী তাতে লিখতে হবে। তখন বাজে বিকেল ৪.৪০। আমি বললাম “যাঃ – আজকে হল না তাহলে”? উকিলবাবু বললেন, “আসলে আপনি দূরে থাকেন। আইনের একটা নির্দিষ্ট পথ আছে। আপনি একবার খপ্পর থেকে বেরিয়ে গেলে আপনাকে পাওয়া মুশকিল। তখন আপনি বলবেন, কেসের গুলি মারো। কে আবার ফেরত যাবে বাংলা থেকে কাশ্মীর”। এই শুনে সবাই একটু হেসে উঠল। অগত্যা আজকের মতো থানায় ফিরে চললাম।

     ফেরার সময় Ukhral থেকে Magarkot নামতে হবে। সবাই বলছে ২৪ ঘণ্টা গাড়ি চলে। সত্যিই তাই দেখছি। কিন্তু কোনো গাড়িই দাঁড়ায় না। সব গাড়িই আগে থেকে ভর্তি হয়ে আসছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি না পেয়ে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, আরও ওপর দিকে ১ কিমি হেঁটে যেতে হবে। ওখানে গাড়ি খালি পাওয়া যেতে পারে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। সবাই দেখছে গাড়ির চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা কেউ বলেনি। এই হচ্ছে এদের মুশকিল। অর্ধেক কথা বলে।

     এবার চললাম ওপরের দিকে। বেশ কিছুটা গিয়েও কিছু পেলাম না। একটা হুড খোলা মালবাহী গাড়ি আসছিল। তাকে বলাতে সে তুলে নিল। সঙ্গে আরো দু তিনজন উঠলো। এবার শুরু হল বৃষ্টি। যদিও টিপটিপ করে। কিন্তু অতটা রাস্তা আসতে আসতে পুরো ভিজে গেলাম। আমার সঙ্গের ব্যাগটা কেবিনে একজনের হাতে দিয়ে দিলাম যাতে অন্তত কাগজগুলো না ভেজে। এইভাবে প্রায় ১০ কিমি নিচে মাগারকোটে নেমে এলাম। এরা ভাড়া নিলনা। এবার হেঁটে হেঁটে রামসু থানা। সেখানে মুন্সী পরিহার সাহেবকে কাগজপত্র দিতে তিনি বললেন সব রেডি করে রেখে দেবেন।

     এবার পরদিন সকালের কথা। আজকে আমায় যে করেই হোক সাইকেল পেতেই হবে। ফলে সকাল সকাল কোর্টে যাবো। মুন্সীর থেকে সকালেই কাগজপত্র যা নেবার নিয়ে নিলাম। কোর্টে পৌঁছে গেলাম ১১’টায়। উকিলবাবু আমার কাগজপত্র সব পড়ে দেখলেন। তারপর বললেন, “সবই তো ঠিক আছে। কিন্তু কোথায় লেখা আছে যে এটা আপনার সাইকেল? কী করে প্রমান হবে সেটা”? আমি অনেককিছু যুক্তি দিলাম। কিন্তু উনি বললাম এসব কথা কোর্টে গ্রাহ্য হয়। তারচেয়ে জজ্‌ সাহেবকে অনুরোধ করে দেখতে হবে। বলি যে আপনি দূর থেকে এসেছেন। বাকিটা ওনার হাতে। আমি ওনাকে শুধু এটুকু বললাম যেন আজকেই কাজটা সম্পন্ন হয়। যদি না হয় তো বলে দিন। সাইকেলটা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যাবো। আমার পক্ষে এর বেশি কিছু প্রমান করা সম্ভব নয় যে ওটা আমার সাইকেল। যদিও সাইকেল সমেত প্রচুর ছবি আছে আমার সাথে। আর যদি সম্ভব হয় তো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে দিন। কারণ কালকে বেরতে গেলে আমাকে আজ অনেককিছু গুছোতে হবে। উনি খুব সুন্দরভাবে আমাকে বোঝালেন যে হড়বড় করে লাভ নেই। এটা ওনার ইচ্ছায় হবে না। কোর্টে পরপর লিস্ট অনুযায়ী ডাক পড়ে। অপেক্ষা করতে হবে।

     বসে আছি। হঠাৎ দেখি উকিলবাবু ডাকছেন। ব্যাগটা ওনার টেবিলেই রেখে আসতে বললেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এজলাসে ঢোকার আগে গেঞ্জির কলারটা ঠিক করে দিলেন। জজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জজ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি হিন্দি বোঝেন”? আমি বললাম হ্যাঁ। আমার সাথে বেশি কথা না বলে উকিলের সাথেই কথা বলতে লাগলেন। ওনার প্রশ্ন হল, কোর্টের সমন হলে অত দূর থেকে আমি আসবো কিনা। যাই হোক, আমার ব্যাপারে পুলিশের তরফে কোনো আপত্তি আছে কিনা জানতে চাইলেন। তারা আপত্তি করলেন না। এবার উনি আমাকে একটা এফিডেফিট করতে বললেন যে আমি যেন আবার এখানে ডাকা হলে আসতে বাধ্য থাকি। আমি রাজি হলাম।

     এবার এটির জন্য আবার সেই ই–স্ট্যাম্প এবং আবার এক কিমি ওপরে যাবার ব্যাপার। তবে আজ আর দেরি হয়নি। আমার কাজ মিটে গেল দুটোর মধ্যে। থানায় ফিরে এলাম বিকেল ৪’টের মধ্যে। মুন্সীকে দেখতে পেয়ে কাগজ দেখালাম যেটা কোর্টের রিলিজ অর্ডার। তিনি বললেন একটা ছবি তুলতে হবে সাইকেল সমেত আমার। তারপর সাইকেল ছেড়ে দেওয়া হবে। এতক্ষণে আমি মুক্ত হলাম। নিশ্চিত হলাম যে কাল আমার যাওয়া হচ্ছে। আপাতত আমার কিছু করণীয় নেই।

     ঠিক করেছি কাল সকাল ৫’টার সময় রওনা দেবো শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে। ফলে কাগজপত্র যা নেবার কালকে পাবো না। অত সকালে কেউ থাকবে না। যা নেবার আজকেই নিতে হবে। তাই মাঝে মধ্যেই ঘুরঘুর করছি অফিসের সামনে। কিন্তু মুন্সীর দেখা পাচ্ছিনা। এই করতে করতে সন্ধ্যে সাতটা হয়ে গেল। দেখি মুন্সী ও বাকি পুলিশরা অফিসের সামনে বসে গল্প করছে। আমি অপেক্ষা করছি, কখন মুন্সী আমার দিকে তাকাবেন। তিনি গল্প করেই চলেছেন। তিনি তাকিয়েও তাকাচ্ছেন না। পাশে বসা একজন S.I. আমাকে বললেন, একটু পরে আমাকে তিনি ডেকে নেবেন। কাগজে আমাকে সই করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিয়ে দেবেন। আমি ড্যাং ড্যাং করে নিজের কাজে চলে গেলাম।

     থানায় ঘুরঘুর করার দৌলতে এখানকার সমাজের চরিত্রগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রথম দিন থেকেই দেখছি, এখানে যত মানুষ থানায় আসছে, সবটাই ঘরোয়া বিবাদ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর তার বৌকে মেরেছে। এমনই সে মারের বহর, খুব বেশিরকম আহত হচ্ছে বউরা। একজন মেয়েকে দেখলাম মাথায় ব্যান্ডেজ করে এসেছে। তার বাবা ও মা দুজনেই আছে। মা অতি বৃদ্ধা। তিনি S.I. এর গলা ধরে মাথায় টোকা মেরে দেখালেন শক্ত লোহা দিয়ে কিভাবে তার মেয়ের মাথায় মারা হয়েছে। বাকিদের ঘটনাও মোটামুটি এরই কাছাকাছি।

     এইসব অপরাধীরা কিম্বা অভিযোগকারীরা বড়বাবুর ঘরের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে থাকে। বড়বাবুর ঘরে ঢুকবো বলে একদিন বাকিদের সাথে এই বেঞ্চে বসে আছি। পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। ফাঁক দিয়ে উনি দেখতে পেয়েছেন আমাকে। বললেন, “সন্দীপজী, এদিকে আসুন। ঘরে ঢুকতে একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, “আপনার জায়গা এখানে। আমি না থাকলে মুন্সীর ঘরে বসবেন। আর কোথাও আপনি বসবেন না। আপনি হচ্ছেন নেতাজি সুভাষ বোসের রাজ্যের লোক। সুভাষ বোস প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের কী পরিবর্তন হতে পারত সেই আলোচনায় ডুব দিলেন”। বাঙালী হিসেবে একটু গর্ববোধ হচ্ছিল বইকি।

     আবার আগের কথায় ফিরে আসি। রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। খেতে এলাম পুলিশের মেসে। এতদিন এদের মেসেই খাচ্ছি। কাল সকাল পাঁচটায় যদি বের হই, এরপর আর কখন কাগজ নেবো আর কখন শুতে যাবো। অগত্যা অফিসে যেতেই হল। দেখি অন্য একজন S.I. বসে আছেন। তাকে ঘটনা বলে বললাম আর আমার সময় নেই। আমাকে এখুনি যা দেবার দিয়ে দিন। কাল সকালে বের হবো। (তারা ভাবছেন হয়তো যে এত তাড়ার কী আছে। দেরিতে বের হলে কী হয়েছে। কিন্তু আমার পরিকল্পনা আমার কাছে। তাদের কী করে বোঝাব)। তিনি মুন্সীকে ফোন করলেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে অত রাতে আসতে হল। এসে থানার সামনে সাইকেল সমেত আমার ছবি তুললেন। দুটো সাদা খালি কাগজে সই করালেন। আমাকে কী কাগজপত্র দেবেন সেটা জানতে চাইলাম। উনি বললেন, “কাগজ আবার কী দেবো? আপনার সাইকেল আটকে ছিল, পেয়ে গেলেন। আবার কী চাই”। আমি বললাম যদি গেটে সকালে আটকায়? ওরা তো কিছু জানেনা। উনি বললেন কেউ আটকাবে না। আটকালে আমাকে ফোন করবেন। আমি তথাস্তু বলে রাতে ঘুমের জগতে চলে চলে গেলাম।

     এ যাত্রার উদ্দেশ্য হল লাদাখের বৌদ্ধ ধর্মের ওপর একটি বই লেখা। সে অনেক লম্বা গল্প। সেই লম্বা সফরের মাঝে এই সাইকেল চুরি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। এই পর্বে সেটির পাঠ চুকল। বহু কাহিনী পরে রইল। সেসব জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আগামী বই প্রকাশের জন্য।

Similar Posts

  • মিলন

    মিলন আজ সম্পূর্ণ লকডাউন। সে দিনও তাই ছিল।গোড়া থেকেই বলি। ১৯৫৭ সালের ১লা এপ্রিল। এপ্রিল ফুলের দিন তার জন্ম। আবার সেই দিনই নয়া পয়সা (খুচরো এক-দুই-তিন-পাঁচ এইরকম পয়সাকে নয়া পয়সা বলা হত) চালু হয়েছিল। তাই তার ‘ন’-কাকা তাকে নয়া পয়সা বলেই ডাকতেন। এ’হেন মিলন প্রথম কথা শিখেছিল একটু দেরিতে। তার প্রথম মুখনিঃসৃত শব্দ ছিল “অ্যাগু…

  • একটি চুরি যাওয়া সাইকেল

    একটি চুরি যাওয়া সাইকেল পর্ব – ২ আমাদের নিজেদের প্রদেশে থানাতে গিয়ে সব সময়েই একটা Rejection এর মনোভাব দেখি। কিন্তু এখানে সান্ত্রী বেশ মনোযোগ নিয়ে মুন্সীর ঘরে পাঠালেন। সেখানে ছিলেন ‘পারিহার’ সাহেব। তাঁকে সব বিস্তারিত বললাম। তিনি তাঁর অফিসারকে ফোন করলেন। আমাকে একটা প্রাথমিক বর্ণনা বলতে হল যেটা উনি লিখে নিলেন। তাঁর পাশে একটি কম…

  • সিন্ধু তুমি কার

    সিন্ধু তুমি কার ছোটবেলা থেকে এতবার শুনে আসছি গানটা, সময় পেলেই গুনগুনিয়ে উঠি – “গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা, কাবেরী যমুনা ওই….”। সব নদীগুলো ইচ্ছে হলেই দেখতে পারি শুধু ‘সিন্ধু’ ছাড়া। সে নাকি হাতের নাগালে নয়। যে দূর থেকে হাতছানি দেয়, তার প্রতি বোধহয় টান বেশি জন্মায়। তাই মনে মনে তাকে বলতাম, যখন তুমি আস্ত একটা নদী…

  • বিদ্যুৎ মহারাজ

    বিদ্যুৎ মহারাজ বিদ্যুৎ মহারাজের সন্ন্যাসে রূপান্তরের গল্প   চলার পথে পড়ে থাকা সম্পদ যা কিছু চোখে পড়ে, তা চাক্ষুষ করে আমার জীবন সার্থক হয়। কোন পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এসব সম্পদ আমার কাছে ধরা দেয়। যেমন বনগাঁ ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিদ্যুৎ মহারাজ। সাধারণ একটি পরিবারের সন্তান হয়ে কিভাবে তিনি ধীরে ধীরে একটি সংঘের মহারাজ হয়ে উঠলেন, তাই…

  • জাঁস্কারের বন্দীদশা

    জাঁস্কারের বন্দীদশা জাঁস্কার হল লাদাখের প্রাচীনতম অঞ্চল, দুর্গমও বটে। তাই লাদাখের অন্যান্য জায়গার থেকে জাঁস্কার কিছুটা বিচ্ছিন্ন। যেখান দিয়েই যাওয়া হোক না কেন, এখানে যেতে গেলে কোনো না কোনো গিরিপথ (Pass) অতিক্রম করতেই হবে। লাদাখি ভাষায় গিরিপথকে বলা হয় ‘লা’ (La)। যদি কার্গিল থেকে জাঁস্কার যেতে হয় তবে পেরোতে হবে ‘পেনজি লা’ (Penzi La)। যদি…

  • গোরাচাঁদ পীর মাজার

    স্হানীয় মানুষ একে এককথায় হাড়োয়া মাজার বলেই চেনে। এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে এটির। ২৯শে ফাল্গুন এখানে বার্ষিক উৎসব হয়। স্হানীয় হিন্দু ঘোষ পরিবারের সদস্যরা প্রথম এখানে এসে দুধ দিয়ে মাজার ধুয়ে পুজো দেন। তারপর মুসলমানদের পুজো শুরু হয়। যদিও হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলের কাছে এটি পবিত্র ধর্মস্হান। দুনিয়ায় এতকিছু ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও এখানে আজ পর্যন্ত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *